Thursday, July 30, 2020

একটি বড়োদের রূপকথা

বড়োদের রূপকথা হয় নাকি আবার? হয় তো! কিন্তু রূপকথা তো বড়োদের ঢঙে লিখবার নিয়ম নেই। তাহলে আমরা ছোটদের মত করেই একটা বড়োদের রূপকথা বলার চেষ্টা করি না হয়!

অনেক অনেক কাল আগের কথা, এক দেশে ছিল এক রাজা আর কয়েক রাণী। সেকালে রাজাদের কয়েকজন করে রাণী থাকাই ছিল দস্তুর। রাজার ছেলে হত সিংহাসনের উত্তরাধিকারী, সেই উত্তরাধিকার নিয়ে রাজপুত্রদের ভাইয়ে ভাইয়ে ঝগড়া হত, খুনোখুনি হত, আরো কত কী! ইলেকশন নেই, ভোটাভুটির বালাই নেই- বেশ সোজাসাপ্টাই ছিল এই রাজা হবার বিষয়টা। ওহ হো, রাজকন্যাদের কথা তো বলাই হয়নি! রাজকন্যাদের বিয়ে হত দূর দূর দেশের রাজপুত্রদের সাথে, তাতে সেই দূরদেশের সাথে রাজ্যের একটা সম্পর্কও তৈরি হত। রাজ্যে রাজ্যে বিরোধ হত, যুদ্ধ হত, তখন এসব বন্ধু দেশের সাহায্যের দরকার পড়ত।

তো সেকালে রাজারাজড়া ছাড়াও দেশে ছিল আমজনতা- সেযুগে তাদের বলা হত রাজার প্রজা। এই প্রজারা একরকম রাজাদের সম্পত্তিই ছিল বলা চলে। তারা সারাবছর খাটাখাটনি করে পেট চালাত, সময়মত রাজাকে খাজনা দিত। কপাল ভাল হলে রাজারা হতেন ভালমানুষ টাইপের, প্রজাদের খাজনা পেয়েই খুশি থাকতেন। আর কপাল খারাপ হলে রাজা হতেন অত্যাচারী, যাকে যখন খুশি শূলে চড়াতেন, মেরে ধরে দেশ শাসন করতেন। সেকালে এই রাজাদের যুগে প্রজারা সুখে ছিল নাকি কষ্টে ছিল সে খবর ইতিহাসের বইয়ে পাওয়া যায় না। হয়ত তাদের ভাল থাকা না থাকা ততটা মাথা ঘামানোর ব্যাপারই ছিল না সেকালে।

আমাদের গল্পে ফিরে আসি বরং, যেদেশের কথা বলছি সেদেশের রাজা কেমন মানুষ প্রজারা ঠিক জানেনা। কী করে জানবে, কখনো চোখেও তো দেখেনি রাজা-রাণী-রাজপুত্রদের! রাজার পাইক পেয়াদারা সময়মত খাজনা নিয়ে যায়। রাজকোষে সব দিয়ে থুয়ে যা থাকে তা দিয়ে কেউ খেয়েপরে চলতে পারে, কেউ পারে না। সেবার খরার বছরে রাজার মেয়ের বিয়ে হল মহা ধুমধাম করে দক্ষিণের রাজ্যের মাঝবয়সী রাজার সাথে। বাড়তি খাজনা দিতে গিয়ে কিছু লোক না খেয়ে মরল ঠিক, কিন্তু সে বিয়েতে নাকি রাজ্যের বড় উপকার হয়েছিল; পশ্চিমের মারকুটে রাজারাও আমাদের রাজাকে সমীহ করে এখন!

তো, ভালই চলছিল সবকিছু। একদিন রাজ্যের বন্দরে এসে ঠেকল আনকোরা এক জাহাজ, ঝকঝকে তকতকে সে জাহাজ ভরা চমৎকার দেখতে সব যুবাপুরুষ, তাদের মাঝে স্বর্ণকেশী অনেক নারীও আছে। কিন্তু এই নারীপুরুষরা ঠিক এই রাজ্যের মানুষের মত নয়। তারা দেখতে বেশ শক্তপোক্ত ধরণের, চলন বলন এমন যে সমীহ না করে উপায় নেই। রাজ্যের বুড়োরা দূর থেকে উঁকিঝুঁকি দিয়ে দেখল, একটু সাহসী কমবয়সী তরুণরা গেল আরেকটু কাছাকাছি, শুধালো- কে গো তোমরা? তোমাদের রাজা কোথায়?


-     
রাজা? সে আবার কী? আমাদের তো কোন রাজা নেই!

-      রাজা নেই?’ চোখ কপালে উঠল প্রশ্নকর্তার। ‘তাহলে তোমাদের শাসন করে কে? দণ্ডমুণ্ডের বিধান দেয় কে? খাজনা নেয় কে?

-      সে আমরা সবাই মিলেই ঠিক করি। ফি বছর সবাই মিলে আমাদের মধ্য থেকেই কয়জনকে নেতা ঠিক করে, তারাই সকল সিদ্ধান্ত নেয়। খাজনার টাকা কোথায় কী খরচ হবে তাও তারা ঠিক করে, বছর শেষে তার হিসেবও দেয়।

উল্কার বেগে এই নতুন দেশের খবর ছড়িয়ে গেল আমাদের এই ছোট্ট রাজ্যে। এমন আজব কথা কেউ কখনো শোনে নি- এমন রাজ্য যেখানে রাজা নেই, রাণী নেই, নেই রাজপাট। বুড়োরা নাক কুঁচকে বলল- এ আবার কেমন ছিষ্টিছাড়া দেশ! রাজরক্ত না থাকলে কাউকে মানবে কেন প্রজারা? আর রাজা ছাড়া প্রজার ভালমন্দ দেখবে নাকি কেউ? তরুণ যুবারা অবশ্য এসব কানে তুলল না, তারা বরং নতুন জাহাজের মানুষদের খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল অসীম কৌতূহল নিয়ে।

এক ঝলমলে সকালে নতুন জাহাজটা যেমন নোঙর ফেলেছিল, তেমনি এক সন্ধ্যায় গোলাপি আকাশকে পেছনে ফেলে জাহাজ আবার পাল তুলল। কিন্তু রেখে গেল শত শত প্রশ্ন, আর আনকোরা নতুন চিন্তা। তরুণরা গালে হাত দিয়ে ভাবতে বসল- তাই তো! রাজার ছেলে বলেই কেউ রাজা হবে কেন? প্রজাদের পছন্দ অপছন্দের দাম কেন থাকবেনা?

বছর গড়ায়, খাজনার সময় ঘনিয়ে আসতে থাকে। বড় বড় চিন্তা বাদ দিয়ে রাজ্যের লোকে নিত্যকার কাজে নেমে পড়ে, অলস চিন্তার আর সময় কই? আস্তে আস্তে তাদের স্মৃতিতে ঝাপসা হয়ে আসে সেই আজব জাহাজের কথা।

মানুষ প্রায় ভুলেই গেছিল, বছর কয় পর এক ভোরে বন্দর থেকে ছুটতে ছুটতে এল এক কিশোর। এসেছে! সেই স্বপ্নের দেশের জাহাজ আবার এসেছে! কাজ ফেলে লোকে ছুটল পুরনো অতিথিদের আবার দেখতে।

সবার চোখেই এইবার কিছু পরিবর্তন যেন ধরা পড়ল। জাহাজের জৌলুস যেন আগের চেয়ে একটু কম, কিন্তু মানুষের সংখ্যা যেন আগের চেয়ে বেশি, আর জাহাজটার আকারও যেন একটু বেড়েছে। এখনো হাসিখুশি তারা, কিন্তু কারোর কারোর ভুরুতে যেন একটু চিন্তার ছাপ, ঝলমলে আনন্দে যেন একটু ভাটা পড়েছে!

যথারীতি এবারও রাজ্যের প্রবীণরা রইলো দূরে দূরে। কিন্তু তরুণদের ভীষণ আগ্রহ এই আজব জাহাজের মানুষদের নিয়ে, তারা তাদের কাছে ঘেঁষার চেষ্টা করল প্রথমদিনেই- দু’চারজন খাতিরও পাতালো কারো কারো সাথে। তাদের কাছ থেকেই জানা গেল সব ঘটনা-

এই জাহাজের সবই ছিল ঠিকঠাক, একেবারে নিখুঁত, পরিপাটি। কিন্তু এর ঝলমলে মানুষগুলো প্রায় ভুলেই গিয়েছিল জাহাজের খোলের মধ্যে বসে দাঁড় টানে যে মানুষগুলো তাদের কথা। কোন এক দিন জাহাজের সব দাঁড়ি একযোগে দাবি তুলল, জাহাজ চালাতে তাদেরও মতামত নিতে হবে। আর অন্যদের মত তাদেরও নানা সুযোগ সুবিধা দিতে হবে, এই গাধার খাটনি আর তাদের পোষাচ্ছে না! খুবই যৌক্তিক দাবি সন্দেহ নেই, কাজেই জাহাজের নিয়ম কানুন নতুন করে লেখা হল। জাহাজের খোলের ভেতর যারা কাজ করে তাদেরও মত নেয়া হবে সব বিষয়ে- এমনটাই ধার্য হল। এই পর্যন্ত তাও সব মোটামুটি ঠিকঠাকই ছিল। কিন্তু ইদানিং নতুন নতুন কিছু কথা শোনা যাচ্ছে, এদেরই কেউ কেউ নাকি রব তুলেছে তাদেরও জাহাজের বাকিদের মত রেশমের রুমাল চাই, আর চাই জড়িদার জুতো! কিন্তু ওদের এই কালিঝুলিমাখা কদাকুচ্ছিৎ চেহারায় এসব বাহারি জিনিস কি মানায়?- এই অদ্ভুত আবদার শুনে তাই জাহাজের ঝলমলে সুন্দর মানুষদের অনেকেই বেশ বিরক্ত, মনঃক্ষুণ্ণ।

খুব মুশকিলের ব্যাপার সন্দেহ নাই, রাজ্যে সবার মুখে মুখে এইসব ঘটনা ছড়িয়ে গেল মুহূর্তের মধ্যে। বুড়োরা মুখ ভেংচে বলল- উপযুক্ত রাজার শাসনে না থাকলে এমনই হয়, যত্তসব বিশৃঙ্খলা! তরুণদের মধ্যে জাহাজের দাঁড়িদের পক্ষে বিপক্ষে সোজা দুই ভাগ হয়ে গেল- কিন্তু কেউই এই অদ্ভুত সমস্যার কোন সমাধান দিতে পারল না!

আমাদের ছোট্ট রাজ্যের মানুষদের একরাশ চিন্তা আর তর্কবিতর্কের মধ্যেখানে ফেলেই আবার এক সন্ধ্যায় পাল তুলল সেই বিদেশি জাহাজ। কিন্তু এসব বিষয় নিয়ে রাজ্যের লোকের আলোচনা চলল আরো কিছুদিন। নিত্যকার কাজের ফাঁকে ফাঁকে তরুণরা ঘাড়ের রগ ফুলিয়ে তর্ক করল সেই জাহাজের নিয়মকানুন নিয়ে। আরো কিছুদিন হয়তবা এই আলোচনা চলত- কিন্তু এর মাঝেই এল ভীষণ বন্যা। নদীনালার কূল ছাপিয়ে, লোকের ঘরদোর, ক্ষেতের ফসল সব ভাসিয়ে নিয়ে গেল বন্যার স্রোত। গোদের ওপর বিষফোঁড়া- এই বন্যার মাঝেই পশ্চিমের রাজ্যের সাথে কী একটা যুদ্ধও বেঁধে গেল বলতে গেলে হুট করেই। যুদ্ধের সৈনিকদের খাবার, অস্ত্রের ব্যবস্থা করতে বন্যার মধ্যেও খাজনা গেল বেড়ে। লোকের নাভিশ্বাস উঠে গেল খাজনা শোধ করতে, পেটের দায়ে দলে দলে তরুণরা যুদ্ধে যোগ দিল। তাদের মধ্যে কেউ কেউ ফিরে এল, অনেকেই ফিরে এল না। যুদ্ধে হেরে রাজা দক্ষিণের রাজ্যে গিয়ে আশ্রয় নিল, এদিকে পশ্চিমের রাজা দখল করে নিল আমাদের এই ছোট্ট রাজ্য। যদিও এসমস্ত কিছুই লোকমুখে শোনা, প্রজারা আগের রাজাকেও কোনদিন চোখে দ্যাখেনি, কাজেই এই খবরেও তাদের কোন ভাবান্তর দেখা গেল না।

সবকিছুরই শেষ আছে, কাজেই একদিন আবার সব শান্ত হয়। যুদ্ধ শেষ হয়, বন্যার পর রাজ্যে নতুন ফসল ওঠে। বেঁচে থাকা মানুষেরা নতুন করে ঘর তোলে, সংসার পাতে। এত এত ঝুটঝামেলায় অন্য কিছু ভাবার সময় কই? জীবন আবার নিস্তরঙ্গভাবে বয়ে চলতে থাকে আমাদের গল্পের রাজ্যের মানুষদের।

বেশ অনেকদিন পর, দূর সমুদ্রের ওপর দেখা গেল একটা জাহাজের মাথা। এই বন্দরে জাহাজ আসে খুব কম, কাজেই উৎসুক চোখের অভাব হল না। কাছাকাছি আসতে অবাক বিস্ময়ে মানুষ চিনতে পারল, এই তো সেই বিদেশি জাহাজ; কিন্তু এ কী হাল হয়েছে এর? ঝকঝকে কাঠামো মলিন হয়ে পলেস্তারা খসে পড়ছে, মানুষের মধ্যে না আছে সেই জৌলুস, না আছে সেই ঝলমলে আনন্দ। কোন কথা জিজ্ঞেস করলে জবাব দেয় না- শূন্যদৃষ্টিতে চেয়ে থাকে দূর সমুদ্রের দিকে।

হাত খুলে আপ্যায়ণ করল রাজ্যের লোকেরা এই দিশেহারা মানুষদের। দুদিন ঝিম ধরে থাকার পর ধীরে ধীরে সব বলতে শুরু করল বিদেশি অতিথিরা-

জাহাজের ওপরতলার ঝলমলে সুন্দর মানুষদের সাথে খোলের ভেতরে থাকা দাঁড়ি, খালাসিদের পার্থক্যটা দিনকে দিন বিচ্ছিরিভাবে স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। সমান মতামত দেবার অধিকার পাবার পর আস্তে আস্তে অন্য বিষয়গুলোও সামনে চলে আসতে শুরু করে। রেশমি রুমাল, জড়িদার জুতোর চাহিদাই শুধু নয়, খোলের ভেতরে অন্ধকারে যেখানটায় তাদের খাবার, ঘুমোবার জায়গা- তা নিয়েও আপত্তি তুলতে থাকে তারা। ওপরতলার কিছু মানুষ গোড়া থেকেই এসব ঠিক মেনে নিতে পারেনি। সমস্যা ভীষণ গুরুতর হয়ে উঠল যখন খোলের ভেতর থেকে দাবি উঠল, সবাইকেই সব কাজ করতে হবে! সবার খাওয়া-পরার বরাদ্দ যদি সমান হয়, তাহলে কাজই বা কয়েকজন বেশি করবে কেন? সবাইকেই নিয়ম করে দাঁড় টানতে হবে। যুক্তি এতই অকাট্য যে সবাই মেনেও নিল। নাহ, আসলে সবাই মেনে নেয়নি, কিন্তু দ্বিমত করার সাহসও পায়নি সবার রোষের ভয়ে। জাহাজের খোলের মধ্যে থাকা ওই কালোকুচ্ছিৎ মানুষগুলোকে ওপরতলার মানুষেরা মনে মনে যতই ঘেন্না করুক, কিছুটা ভয়ও আবার পায়! জাহাজের সবচেয়ে জটিল দায়িত্ব যাদের, মানে এই বছরের জন্য সকল সিদ্ধান্ত নেবার দায়িত্ব যেই নেতাদের- তারা পড়ে গেল মহা চিন্তায়, ঘর বন্ধ করে কী সব মিটিং টিটিং করতে লাগল সারাদিন!

এইসব হ্যাপা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছিল যখন সবাই, এক দুর্যোগের রাতে কথা নেই বার্তা নেই জাহাজ আক্রমণ করে বসল জলদস্যুরা। হঠাৎ করেই জাহাজের দায়িত্বে থাকা নেতাগোছের কাউকে খুঁজে পাওয়া গেল না, পরে জানা গেল সামনে বিপদ দেখেই ভাঁড়ার খালি করে ছোট একটা নৌকা নিয়ে তারা পালিয়েছে। সবার খাওয়া-পরার বরাদ্দ সমান থাকলেও জাহাজের ভাঁড়ারে এই মানুষগুলোর বিশেষ যাতায়াত যে ছিল তা অন্যরা তখনই প্রথম জানতে পারে। পুরো জাহাজে নেবার মত খুব বেশি জিনিস অবশিষ্ট ছিলনা, যা ছিল তা-ও ধুয়েমুছে নিয়ে গেল দস্যুদল। বেঁচে যাওয়া যাত্রীরা উদ্দেশ্যহীনভাবে ভাসতে ভাসতে এসে নোঙর ফেলল এই বন্দরে।

ছোট থেকে বুড়ো, সকলেই সত্যিকার অর্থেই বড় কষ্ট পেল অতিথিদের এই দুর্দশার গল্প শুনে। কিন্তু তাদের কী-ই বা করার আছে সান্ত্বনা দেয়া ছাড়া? দুদিন পর যখন বিদেশিরা বিদায় নিল, তখনো তাদের উদ্ভ্রান্ত ভাব পুরোপুরি কাটেনি। চলে যাবার পর রাজ্যজুড়ে কতই না আলোচনা হল তাদের নিয়ে। বুড়োরা জিভ চুক চুক করে বলল, অল্প বয়সীদের বুদ্ধিতে চলতে গেলে এমনটাই হয়- আহারে বেচারারা! তরুণরা কিছুই বলল না, গোল হয়ে বসে মাটিতে হিজিবিজি দাগ টানতে টানতে কী ভাবতে লাগল তারাই জানে। খাজনার সময় এগিয়ে আসছে, নতুন রাজা নতুন কী-সব কর চাপিয়েছে। বিদেশিদের নিয়ে পড়ে থাকলে আমাদের রাজ্যের মানুষদের চলে না। কাজে ফিরতে হল সবাইকেই, কদিন পর বিদেশি বন্ধুদের স্মৃতি বেশ খানিকটা ঝাপসাও হয়ে এল সবার মনে।

শুধু অনেকদিন পর পর রাজ্যের ছোট্ট বন্দরে কোন জাহাজের ভোঁ-ও-ও শব্দ শোনা যায় যখন, একটি কিশোর ছুটে গিয়ে উঁকি দেয়, নতুন কোন জাহাজ এল কি?


 ********************************************

[গত কিছুদিন করোনায় ভুগে হাসপাতালে থাকতে হয়েছে। আক্ষরিক অর্থেই শুয়ে থাকা ছাড়া কোন কাজ নেই, বই পড়লেও মাথায় যন্ত্রণা হত। শুয়ে শুয়ে আকাশ পাতাল ভাবতে ভাবতে নানা গল্প মাথায় ঘোরাঘুরি করত, ভেবেছিলাম একটু সোজা হয়েই সব লিখতে বসব।
সব লেখা হবে কিনা জানিনা, দ্রুতই সুস্থ হয়ে কাজে ফিরতে হবে। তার আগেই এই গল্পটা টুকে রাখলাম ভুলে যাবার আগেই। ]

Sunday, March 29, 2020

করোনাকালীন যত ভাবনা (১)

[করোনাকালীন এই গৃহবন্দি জীবন শুরু হল যখন ভেবেছিলাম স-অ-ব পেন্ডিং কাজ এবার শেষ করে ফেলব, কিছু কাজ এগিয়েও রাখব... কিন্তু দ্বিতীয়দিনই খুব অদ্ভুতভাবে খেয়াল করলাম কোন কাজেই মন বসানো যাচ্ছে না। নিজেকে হাজার অটোসাজেশন দিয়েও কাজ হচ্ছে না, যেটুকু না করলেই না সেটুকু করছি বটে- কিন্তু নিজের শতভাগ দিয়ে করতে পারছি না। তার সাথে যোগ হয়েছে পুরনো বন্ধু ব্যাকপেইন। একটা বিষণ্ণ পৃথিবীতে ততোধিক বিষণ্ণ সময়ে কেমন যেন একটা বিদঘুটে অনুভূতির মধ্য দিয়ে ঝড়ের বেগে দিনগুলো চলে যাচ্ছে! 

আজকে মনে হল- এই সময়টা লিখে ফেলা উচিত। আমাদের প্রজন্মের  যারা পরে এই সময়ের স্মৃতিচারণ করবে তাদের স্মৃতির উপর ভরসা না করে কিছু একটা লেখা থাকুক! নিজের জন্যেই!! ]

মানুষ নামক বিচ্ছিরি প্রজাতিটা এযাত্রা হয়ত টিকেই যাবে (কতদিনের জন্য সেটা ভিন্ন আলোচনা)! তবে মানুষের ইতিহাসে ২০২০ একটা অদ্ভুতুড়ে বছর হয়েই থাকবে সন্দেহ নেই! কোত্থেকে এক ভাইরাস, যেটা তেমন একটা প্রাণঘাতী নয়, সত্যি বলতে অবিশ্বাস্য দ্রুত ছড়ানো ছাড়া তার তেমন কোন বিশেষত্বও নেই- অথচ গোটা পৃথিবীকে আক্ষরিক অর্থেই স্তব্ধ করে দিয়েছে! অর্থনীতি নামক আপাত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টাকে প্রায়োরিটির বিচারে হাস্যকর বানিয়ে ফেলেছে। সভ্যতার যেসব মাপকাঠি মেনে আমরা গত কয়েক দশক পার করেছি তার সমস্ত কিছুকেই অর্থহীন করে দিয়েছে একটা ক্ষুদ্র জীব!

অবশ্য মানুষ ছাড়া অন্যান্য প্রাণিদের কাছে ব্যাপারটা সম্ভবত স্বস্তির! প্রকৃতির ক্যান্সার এই মানুষ নামের প্রাণি মোটে সপ্তাহখানেক দরজা বন্ধ করে আছে তাতেই বাতাসে দূষণ কমে গেছে, সৈকতে নেচে বেড়াচ্ছে গোলাপি ডলফিন! গাছপালার সাথে জিনগত পার্থক্য একটুখানি বেশি হওয়ায় তাদের অভিব্যাক্তি বুঝতে পারি না, তারাও নিশ্চয়ই হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে কয়দিনের জন্য! 

ভাইরাস নামটা কার জন্য বেশি প্রযোজ্য- মানুষ নাকি করোনা? কে বলতে পারে!

বড় বড় চিন্তা বাদ দেই বরং! কিছু ব্যক্তিগত আলাপ করা যাক। নূহের নৌকায় আমরা কেউই জায়গা পাব কিনা নিশ্চিত নই। এজন্যই হয়ত এই কদিন হুটহাট মৃত্যুচিন্তা আসছে। না- মৃত্যুভয় নয়, বরং মৃত্যুসম্পর্কিত চিন্তা বলা চলে। 

আজ এই মুহূর্তে মারা যাই যদি, আমার জীবনে কী কী আফসোস থাকবে? ছোট ছোট অনেকগুলো কাজ অসমাপ্ত রয়ে যাবে, তবে তা নিয়ে আফসোস নেই। পঁচানব্বই বছর বয়সে মারা গেলেও এরকম অনেক কাজ রয়ে যাবে আমি নিশ্চিত! আর কোন কাজের জন্যেই পৃথিবীতে কেউ অপরিহার্য নয়। অনেকক্ষণ ভেবেও তাই আফসোস হবার মত কিছু মনে পড়ল না। সম্ভবত আমি বিরক্তিকর রকমের সুখী ও ভাগ্যবান একজন মানুষ যার জীবনে বলার মত কোন খেদ নেই। জীবনের কাছে বরং আমি ভীষণরকম ঋণী বলা চলে। কারণগুলো এক এক করে ভাবা যাক-

প্রথমত, ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে আমি স্বাধীন, বলার মত কোন কম্প্রোমাইজের মধ্য দিয়ে আমাকে প্রতিনিয়ত যেতে হয়না। ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে ব্লগে লেখার মানে নেই, তবে পেশাগত জীবন নিয়ে একান্ত নিজের কিছু উপলব্ধি শেয়ার করা যেতে পারে। 

আমার চেনা পরিচিত বলয়ের মানুষদের খুব কমই দেখেছি নিজের অফিস বা পেশা নিয়ে সন্তুষ্ট, বরং অফিসের প্রেশারে মাথা নষ্ট, বসের চোখ রাঙানি দেখে জীবন বরবাদ হয়ে যাওয়া মানুষই চারপাশে বেশি দেখি। কিছু মানুষের আসলেও হাত পা বাঁধা থাকে, চাইলেও তাই বড় সিদ্ধান্ত নিতে পারেনা। কিন্তু বেশির ভাগ মানুষ সারাজীবন অদৃশ্য একটা শেকলে বাঁধা পড়ে থাকে- যেই শেকল কত নাজুক তা জীবনের শেষদিন পর্যন্তও অনেকে বুঝে উঠতে পারেনা। 

বছর দেড়েক আগে যখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি ছেড়ে আসি, তখন থেকে এখন পর্যন্ত শত শত বার মানুষের প্রশ্ন এবং হাইপোথিসিস টেস্টিঙের সামনে পড়তে হয়েছে। ইনিয়ে বিনিয়ে অনেক উত্তর দিয়েছি যেগুলো সবই সত্য, (যদিও খুব কম লোকই তা বিশ্বাস করেছে!) কিন্তু সত্যিকারের কারণটা খুব কাছের মানুষ ছাড়া কাউকে বোঝাতে পারিনি, সেটা হল-
আমার ভাল লাগছিল না!

শিক্ষকতা আমার পছন্দের কাজ, যেই বিষয়ে পড়াতাম সেটাও প্যাশনের জায়গা। কিন্তু একটা সময়ের পরে মনে হচ্ছিল যেন ঠিক আমার নিজের  কাজ করা হচ্ছেনা! এই চিন্তাটা মাথায় সর্ষেবীজের মত ঢুকে একটা সময়ে ফুলেফেঁপে বিশাল হয়ে দাঁড়াল। শেষমেশ একসময় মনে হল- নাহ! ছেড়ে যাবার সময় হয়েছে! 

মাস শেষে বাড়িভাড়াটা আমাকেও দিতে হয়, প্রতিদিনের বাজারে আলুটা, মুলোটা এমনি এমনি পাওয়া যায় না, এসকল বাস্তবতার পরেও সবচেয়ে দামি যেই উপলব্ধি আমি এই জীবনে পেয়েছি তা হল- নিজের পছন্দের কাজ করেও আসলে বেঁচেবর্তে থাকা যায়! (এই উপলব্ধির কৃতিত্ব অনেকখানি আমার বস উন্মাদের সম্পাদক আহসান হাবীবের, আমার জীবনে ওনার ভূমিকা বলতে গেলে আস্ত উপন্যাস হয়ে যাব, কাজেই এখন সে প্রসঙ্গ থাক!) 

পেশাগত জীবনে আমাকে নিজের বিশ্বাস ও পছন্দের বাইরে গিয়ে কোন কাজ করতে হয়নি, ভাগ্য ভাল থাকলে বাকি জীবনও করতে হবে না আশা করি। সুখী মানুষ হতে আর কী লাগে?

আফসোস না থাক, কিছুই কি চাইবার নেই জীবনে? তা তো আছেই! ভাবতে গিয়ে প্রথমেই যেটা মনে হল- আহা, কতকিছু দেখা হয়নি পৃথিবীর! একে আসলে ঠিক আফসোস বলা চলে না। একজীবনে কতই বা দেখতে পারে মানুষ! তারপরেও বেঁচে থাকলে কী কী করা বাকি আছে তার একটা ছোট লিস্টি করলাম, করে বুঝলাম আলসেমি কমানো এখন সময়ের দাবি!

আপাতত লিস্টে যা যা আছে-
  • পৃথিবী ঘুরে দেখা, পৃথিবীর গল্প শোনা- এক জীবনে যতটা পারা যায়। সম্ভাব্য সব গন্তব্যের নাম লিখে ব্লগপোস্ট দীর্ঘ না করি।
  • ট্রেডিশনাল পেইন্টিং শেখা, এক্রিলিক প্রথম পছন্দ।
  • ক্যারিকেচারে আরো কতরকম এবস্ট্রাকশন করা যায় তা এক্সপ্লোর করা।
  • ছোটদের রূপকথা কয়েকটা মাথায় আর খাতায় আছে- সেগুলি লিখে এঁকে ফেলা। 
  • কোন একটা বাদ্যযন্ত্র বাজাতে শেখা। (নিজের ধৈর্য্যের উপর ভরসা কম যদিও!)
  • নতুন ভাষা শেখা।
  • স্কুবা ডাইভিং শেখা। 
এসমস্ত কিছুই কাজের বাইরে অকাজের কথা। কিন্তু জীবনে শুধু কাজই করতে হবে এমন দিব্যি কে দিয়েছে?

একটা জীবন- পৃথিবীর রূপ, রস, গন্ধ শুষে নেবার জন্য কতই না ক্ষুদ্র! 

Tuesday, January 28, 2020

ব্লগে প্রত্যাবর্তন! স্বাগতম ২০২০!

এই বছরের শুরুতে কার্টুনিস্ট আসিফের ব্লগ পড়ে ইন্সপায়ার্ড হয়ে ঠিক করলাম প্রায় মৃত ব্লগটাকে জীবিত করব, প্রতিদিন না হলেও প্রতি সপ্তাহে একটা আপডেট থাকলে নিজের কাজের একটা লগ মেইন্টেইন করা যায়। যেমন গত কয়েক বছরে কী কী কাজ করেছি তা আমার কোত্থাও গুছিয়ে রাখা হয়নি, এখন চট করে মনেও পড়বেনা।

আজকে মাসের ২৮ তারিখ, বোঝাই যাচ্ছে আমার ডিটারমিনেশনের দুরবস্থা! তবে গতকাল যেহেতু আমার জন্মদিন ছিল, উপলক্ষ্য (কিংবা অজুহাত) হিসেবে এটাকে দাঁড় করানো যেতেই পারে। এও আরেক 'নতুন বছর'!

নতুন বছরের রেজুলেশন নেবার আগে আগের বছরকে একটু রিভিউ করা যাক!

২০১৯ এর বইমেলায় প্রকাশিত
 'সায়েন্স মিক্স-কমিক্স'
গত অনেকদিন ধরেই এটুআই এর কিশোরদের জন্য করা 'এডুটেইনমেন্ট' প্লাটফর্ম কিশোর বাতায়নে  নিয়মিত কমিক্স পাবলিশ করছি প্রজেক্ট টিকটালিক থেকে। ২০১৯ এর বইমেলায় ৬টি বিজ্ঞান কমিক্সের একটা সংকলন বের করা হল 'সায়েন্স মিক্স-কমিক্স' নামে, যার বেশির ভাগই আগে কিশোর বাতায়ন বা অন্য কোথাও প্রকাশিত। এছাড়া বেশ কয়েকটি সায়েন্স আউট্রিচ প্রোগ্রাম ছিল এই বছর। মার্চে ইএমকে সেন্টারে আয়োজিত হল তিনদিন ব্যাপি সায়েন্স ক্যাম্প, যার প্রধান আলোচক ছিলেন ড মুহাম্মদ ইব্রাহীম স্যার, ছোটবেলা থেকে যার কথা মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনছি। এই প্রোগ্রামের সাথে ছিল উন্মাদ, আমার ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনের মেন্টর কার্টুনিস্ট আহসান হাবীবের নেতৃত্বে, আর ছিল ছোট পরিসরে একটি সায়েন্স কার্টুন এক্সিবিশন। আগস্টে একটি ওয়ার্কশপ আমরা করেছি SPaRC এর সাথে কোলাবরেশনে রাঙ্গামাটি মোনঘর স্কুলে, কয়েকটি কারণে এই স্কুলটির কথা আলাদা করে বলতে হচ্ছে। প্রথমত- প্রায় অর্ধশতক আগে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের হাতে শুরু হওয়া এই স্কুলের শিক্ষার্থীদের বেশিরভাগই আদিবাসী, এই প্রথম আমাদের বিজ্ঞান কমিক্স আদিবাসী শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছুলো। দ্বিতীয়ত, এখানের বেশির ভাগ শিক্ষার্থীরাই প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত, পাঠ্যপুস্তকের বাইরের শিক্ষা নিয়ে যেসব কাজ হচ্ছে তার বড় অংশই এই শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছেনা।


ট্রিবিউট টু ম্যাড- শিরোনামে দৃক গ্যালারিতে অনুষ্ঠিত
 কার্টুন এক্সিবিশনের জন্য করা করা কাজ। বিশ্বখ্যাত
'ম্যাড' ম্যাগাজিন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ২০১৯ সালের
আগস্টে এই আয়োজন করে উন্মাদ পত্রিকা
গত বছর ছিল আমার পেশাগত জীবনের বিশা-আ-আ-ল শিফট! ২০১৮ সালের অক্টোবর মাস থেকে আমি অফিশিয়ালি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিদায় নিয়ে চলে আসি। (এরকম ঘি-মাখন চাকরি কেন ছাড়লাম তা নিয়ে অজস্র প্রশ্নের ও ক্ষেত্রবিশেষে হাইপোথিসিসের সামনে পড়েছি, সেটা নিয়ে আলাদা লেখা লিখব একটা কখনো!) মনে মনে স্থির প্রতিজ্ঞা, পরবর্তী এক বছর প্রজেক্ট টিকটালিকে পুরোপুরি সময় দেব, অন্তত বড় কোন প্রজেক্ট হাতে নেব না আপাতত! তবে মানুষ ভাবে এক, হয় আরেক! প্ল্যান ছিল ২০১৯ হবে যাকে বলে 'Year of TIKTAALIK'! জানুয়ারি মাসেই একটা প্রজেক্ট হাতে চলে এল- নিজের কাছেই যেটাকে মনে হল যথেষ্টই গুরুত্বপূর্ণ, এমন যে সেটার জন্য নিজের কয়েক মাস ব্যয় করাই যায়! প্রজেক্টটা এক কথায় বললে রোহিঙ্গ্যা বাচ্চাদের পাঠ্যবই। কক্সবাজারের শরণার্থী ক্যাম্পে এই মুহূর্তে অফিশিয়াল হিসেবে আছে প্রায় ৫ লাখ শিশু, যাদের শিক্ষার ব্যবস্থা করা অন্যতম প্রায়োরিটি এখন। ইউনিসেফের উদ্যোগে তাদের জন্য একটা কারিকুলাম করা হয়েছে, যার একটি বিষয় হল ইংরেজি। লেভেল ওয়ান থেকে ফোর- মোট চারটি লেভেলের বাচ্চাদের জন্য ইংরেজি বিষয়ের পাঠ্যবই (মোট ষোলোটি মডিউল), শিক্ষক সহায়িকা, এবং ক্লাসে ব্যবহারের জন্য পোস্টার, ফ্ল্যাশকার্ড ইত্যাদি পুরো প্যাকেজ প্রণয়নের দায়িত্ব নিয়েছে ব্রিটিশ কাউন্সিল। এই পুরো প্যাকেজের সমস্ত ইলাস্ট্রেশনের দায়িত্বে ছিলাম আমরা। প্রথমে রাফ হিসেব করে দেখা গেল হাজার খানেক ড্রইং সব মিলে, সময় মেরে কেটে নয় থেকে দশ মাস, বড় টিম নিয়ে কাজ করলে ম্যানেজেবল! ছয়মাস পর সেই সংখ্যা দেড় হাজারেরও বেশিতে গিয়ে ঠেকল। সাথে যোগ হল আক্ষরিক অর্থে হাজার হাজার পৃষ্ঠার ডিজাইন! কপাল খুবই ভাল থাকায় শুরু থেকেই টিমে পাওয়া গেল মহাব্যস্ত দশভূজা কার্টুনিস্ট মেহেদী হককে, অবিশ্বাস্য গতিতে কাজ করে এই লোক। বাংলাদেশে এই মুহূর্তে আমার সবচেয়ে প্রিয় ইলাস্ট্রেটর আসিফ রাজি হল এই টিমে কাজ করতে। আর্টিস্টদের মধ্যে পরে আরো যোগ হল রোমেল বড়ুয়া, হাসিব কামাল, সব্যসাচী চাকমা। প্রত্যেকেই দুর্দান্ত কাজ করেছে, তারচেয়ে বড় কথা, টাইট ডেডলাইন থাকার পরেও একজনও সহসা কোন ডেডলাইন মিস করেনি। প্রজেক্টের বিভিন্ন পর্যায়ে ডিজাইনের কাজ করেছে ডিজাইনার মাহবুব ভাই, বাবুল ভাই, আলভী (সদ্য চারুকলায় ভর্তি হয়েছে, সামনে ওকে আরো পাওয়া যাবে আশা রাখি!) এবং রোমেল। ব্রিটিশ কাউন্সিল ক্লায়েন্ট হিসেবে খুবই সেন্সিবল- কাজেই কাজের প্রেশার ছাড়া আর কোন ভোগান্তিতে পড়তে হয়নি!

সুবিশাল এই প্রজেক্ট যখন শেষ হল, বড় একটা দম নিয়ে দেখি- ২০১৯ শেষ!!!

২০২০ সালের খবরগুলো দেয়া যাক আপাতত- প্রজেক্ট টিকটালিকের দুইটা নতুন সায়েন্স কমিক্স বেরুচ্ছে এই বছর বইমেলায়। একটির লেখক ও আঁকিয়ে শাহাদ সাইফ খন্দকার, জাহাঙ্গিরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি ও মলিকুলার বায়োলোজির ছাত্র, বেশ কিছুদিন হল উন্মাদ ম্যাগাজিনে আঁকছে। আরেকটা কমিক্স করব আমি নিজে, প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য। বাকি ডিটেইল যথাস্থানে জানানো হবে। 

বইমেলায় নিজের কমিক্স ছাড়া বইয়ের ইলাস্ট্রেশন আমি খুবই কম করি, তবে এবার দারুণ একটা বই আঁকার সুযোগ হয়েছে, নাম 'মিতু তিতুর সাবমেরিন', প্রিয় লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবালের লেখা। গতবছর বের হওয়া 'মিতু তিতুর টাইম মেশিন' বইটার সিকুয়েল বলা যেতে পারে এই বইটিকে। মিতু তিতু নামের দুই ভাইবোনের নানা এডভেঞ্চার নিয়ে বই। গতবার তারা টাইম মেশিনে চড়ে চলে গিয়েছিল ডায়নোসরের যুগে, এবারের বইয়ে তাদের এডভেঞ্চার সাগরের নিচে। 

'মিতু তিতুর টাইম মেশিন' বইয়ের একটা ইলাস্ট্রেশন
আঁকাআঁকির বাইরে অন্যান্য কাজে জড়িয়ে গেছি এ বছরেও, বিস্তারিত পরে লিখব, তবে সেসব নিয়েও অনেকখানি এক্সাইটেড এখন। আশা করি বছর ভালই যাবে। 

জন্মদিনের রেজুলেশন? না-ই বা লিখলাম!