ঘ্রাণটা প্রথম আমার নাকে আসে যখন ছোটখালারা আমেরিকা থেকে বহুবছর পর দেশে বেড়াতে এলেন। খালু আমেরিকার একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান, তার বাবা পাকিস্তান আমলের সচিব গোছের কিছু ছিলেন, একমাত্র ভাই লন্ডনে বড়সড় কর্পোরেট চাকরি করেন—পুরো পরিবারটিই সমীহ করার মতো। কাজেই খালু এতবছর পর দেশে আসবেন, পরিবারে বেশ একটা হইচই পড়ে গেল। আমরা ভাল প্যান্ট শার্ট পরে সকাল সকাল নারিন্দায় নানুবাসায় গিয়ে হাজির হলাম। বিকেল পাঁচটায় খালাদের ফ্লাইট এয়ারপোর্টে নামল, বাসায় আসতে আসতে রাত ৮টা। কলিংবেলের শব্দে বাসার সবাই দরজার সামনে হাজির; খালা খালু তাদের একমাত্র মেয়ে আর বিশাল চারটা লাগেজ নিয়ে ঘরে ঢুকলেন। সাথে সাথেই আমার নাকে সেই ঘ্রাণটা এসে লাগল—মৃদু কিন্তু কেমন মিষ্টি মিষ্টি একটা ঘ্রাণ। আমার বয়স তখন এগারো, সেদিনের অনেক কিছুই এখন আর মনে নেই—কিন্তু ঘ্রাণটা মনে আছে। সেটা কীসের ঘ্রাণ তা আর জানার সুযোগ পাইনি, কারণ ঢাকার স্যাঁতস্যাঁতে আবহাওয়ায় একদিনের মাথায় খালাতো বোনটা বিশ্রী রকম ঠাণ্ডা জ্বর বাঁধিয়ে ফেলল। খালু তিনদিন মেয়ের জ্বর দেখলেন, চারদিনের মাথায় টিকেট কেটে সবশুদ্ধ শিকাগোর ফ্লাইটে চেপে বসলেন।
দ্বিতীয়বার এই ঘ্রাণটা যখন নাকে এলো তখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। বাবা
ধুম করে চলে গেলেন, মা আমাদের তিন ভাইকে নিয়ে অথৈ পানিতে। নারিন্দার বাসায় নানা নানু
নেই, বড়মামা আর মামী দুই ছেলেমেয়েকে নিয়ে থাকেন। মুখ ফুটে কেউই কিছু বলেন নি, কিন্তু
দুয়েকবার সেখানে যাওয়ার পর মা নিজে থেকেই সেখানে যাওয়া বন্ধ করে দিলেন; ভাড়া বাসা ছেড়ে
দিয়ে চলে গেলেন গাজীপুরে বাবার রেখে যাওয়া এক চিলতে টিনশেডের ঘরে। বাবার পেনশনের টাকায়
ছোট দুজনের স্কুলের বেতন আর বাসার খরচ কোনমতে চলে। কপালগুণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স
পাওয়ায় আমার পড়াশোনার খরচ নামমাত্র; কিন্তু খাওয়াদাওয়া, হাতখরচ, যাতায়াত ইত্যাদির চাহিদা
তো ছিলই। টাকার চিন্তায় মাথা খারাপ অবস্থা, এমন সময়ে এক বন্ধুর মারফতে এক টিউশনির খোঁজ
পেলাম বনানীতে—এ লেভেলের ছাত্রী, ফিজিক্স আর ম্যাথ পড়াতে হবে। অতি উৎসাহে সেদিন বিকেলেই
গিয়ে হাজির হলাম বন্ধুর দেয়া ঠিকানায়। বিশাল ফ্ল্যাটের বাইরে দুজন দারোয়ান, কলিংবেল
বাজাতে দরজা খুলে দিল ছাত্রী নিজেই। খুব টিপিক্যাল বড়লোকের আদুরে মেয়েদের যেমন চেহারা
হয় আর কি—টকটকে ফর্সা গোলগাল মুখ, মাথায় ছোট করে ছাঁটা ফ্যাশনেবল চুল, কানে গোঁজা ইয়ারফোন;
সুন্দর দুই চোখে বুদ্ধির ছাপ আছে বললে অবশ্য বাড়িয়ে বলা হবে। চৌকাঠ পেরিয়ে ঘরে ঢুকতেই
নাকে এসে লাগল সেই ঘ্রাণ—চাপা, কেমন অস্বস্তিকর রকম মিষ্টি মিষ্টি।
ভার্সিটির ছেলেপিলের টিউশনিতে আগ্রহের বিষয় থাকে দুটা—প্রথমটি অবশ্যই বেতন,
দ্বিতীয়টি হলো বিকেলের নাস্তা; ছাত্র মেধাবী বা বুদ্ধিমান টাইপ হলে সেটা পুরোই বোনাস।
প্রথম দুটো নিয়ে অভিযোগ নেই, তবে আমার ছাত্রীর বুদ্ধিশুদ্ধির দৌড় ভালোভাবে টের পেলাম
পড়াতে শুরু করার পর। এক পড়া হাজার বার বুঝিয়ে বললেও বোঝে না, থার্মোডিনামিক্সের সূত্র
জানতে চাইলে হাঁ করে মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। বেতন ও নাস্তা, দুটোই অতিশয় ভাল হওয়ায়
ঠিক রাগ করতে পারি না, ধৈর্য্য ধরে আবার বোঝাই। লিলি, মানে আমার ছাত্রীর বাবা মা বাসায়
থাকেনই না বলতে গেলে, তবে একজন বয়স্ক কাজের মহিলা সারাক্ষণই ঘরময় হেঁটে বেড়ান। কন্যার
দিকে নজরদারির কমতি না থাকলেও কন্যার পড়াশোনা নিয়ে তার বাবা মা কেউই খুব একটা বিচলিত
ছিল বলে মনে হয়নি। আমি পড়ানো শুরু করার পর থেকে পড়ালেখার অবস্থার অনেক উন্নতি হল এমন
না, তবে লিলির আচরণের পরিবর্তন দিনকে দিন বিপজ্জ্বনক রকম স্পষ্ট হয়ে উঠল। টিউশনিটা
ছেড়ে দেয়া খুবই উচিত, কিন্তু মাস শেষে ওই টাকাটার লোভ ছাড়তে পারি না।
নাহ, মিথ্যে বললাম আসলে। টাকাটাই একমাত্র বিষয় হলে বন্ধু শোভন যখন আরেকটা
টিউশনির অফার নিয়ে এলো, আরো বেশি টাকার; সেটায় রাজি হয়ে গেলাম না কেন? সত্যি বলতে রাজি
হয়েও যেতাম হয়ত, যদি না ওইদিনই লিলি হলের গেস্টরুমে এসে হাজির না হতো। আমি আমার জীবনে
এত অবাক কখনো হইনি, পুরো গেস্টরুম ঝলমল করছিল সেদিন। ও নাকি আসলে এসেছিল চারুকলায়,
বেশি আগে চলে এসেছে বলে সময় কাটাতে এসেছে আমার হলে। ওখানে নাকি কী একটা অসাধারণ প্রদর্শনী
চলছে—না দেখলে মানব জীবন বৃথা। যদিও গল্প করতে করতে এত দেরি হয়ে গেল যে প্রদর্শনীটাই
আর দেখা হলো না সেদিন। এরপর থেকে লিলি প্রায় প্রতিদিনই আসত, ক্লাস আর কোচিং এর ফাঁকে।
আমারও এমন অভ্যেস হয়ে গিয়েছিল যে কার্জন হল থেকে বের হয়েই চোখ চলে যেত সামনের রাস্তায়;
লিলির মেরুন রঙের গাড়িটা পার্ক করা আছে কিনা দেখতে। একবার ওর গাড়িতে জোর করে আমাকে
নিয়ে গেছিল একটা রেস্তোরাঁয়, গাড়ি জুড়ে সেই অস্বস্তিকর মিষ্টি ঘ্রাণ; আমাকে টানা উসখুস
করতে দেখে আর কখনো পরে জোর করেনি লিলি।
একদিন মেরুন গাড়িটি আর এল না। এরপর আর কোনোদিনই না। আমিও আর যাইনি ওদের
বাসায়। এভাবে কিছু না জানিয়ে টিউশনিটা ছেড়ে দেয়া নিশ্চয়ই ঠিক হয়নি। আর কিছু না হোক,
বেতনটা নিতে যাওয়া খুবই উচিত ছিল; মাসের শেষ, হাত পুরো খালি। কিন্তু মনে মনে যতবার
ভেবেছি, ওই ঘ্রাণটা কল্পনাতেও এমন অস্বস্তি নিয়ে এসেছে যে শেষে আর যাওয়াই হলো না।
লিলির সাথে আমার আর কোনদিন দেখা হয়নি।
বরাবরই ভাল ছাত্র, তাই পড়াশোনার পর চাকরি পেতে খুব একটা দেরি হলো না আমার।
চাকরিসূত্রে নানাজনের সাথে ওঠাবসা; আর ফিরে ফিরে আসা সেই ঘ্রাণ। সেবার এক ডিপ্লোম্যাটের
বাসায় পার্টিতে গিয়ে ঘ্রাণের তীব্রতায় দমবন্ধ হবার জোগাড় আমার। পার্টি শেষে গুলশান
থেকে মহাখালি, ফার্মগেট হয়ে হেঁটে ফিরেছিলাম বাসায়; মানুষের ঘামভেজা ভারী বাতাসও সেদিন
আমাকে এত শান্তি দিয়েছিল কেউ বললে বিশ্বাস করবে না।
সময় দ্রুত যায়, ব্যস্ত মানুষের সময় যায় চোখের পলকে। এম্ব্যাসির চাকরি থেকে
টপাটপ প্রোমোশন; তাতে অর্থের দৈন্য কাটল, নিজের এজেন্সি খোলার ঝুঁকি নেয়ার অবস্থা হবার
পর চাকরি ছাড়লাম। এজেন্সি খোলার পর সুনাম ছড়ালো দ্রুতই, একসময় জীবনের চাহিদা-যোগানের
সম্পর্ক নিয়ে দুশ্চিন্তা পুরোপুরি ঘুচল। অর্থের চাহিদা ছাড়াও মানুষ কেন কাজ করে সেটা
এক বয়সে বুঝতাম না—এখন বুঝতে শুরু করলাম, যে এটাও এক ধরনের অভ্যাস।
বিয়ে করেছি আজ সাড়ে সতেরো বছর হলো, আমার স্ত্রী রিমি আমার বন্ধুর ছোটবোন।
রিমি আপাদমস্তক সংসারি মেয়ে, আমার ব্যস্ত দৌড়ঝাঁপের জীবনে ঘরদোর, বাচ্চার পড়ালেখা সব
কীভাবে কীভাবে সুন্দর গুছিয়ে ফেলে আমি টেরও পাই না। আমাদের একমাত্র কন্যা নিকিতা এ
লেভেল দিয়েছে, এই বছরের শেষ দিকে আমেরিকা যাবে পড়তে। বাসার নতুন গাড়িটা ওকে দিয়েছি;
আমি আমার পুরনো মডেলটাই চালাই। পুরনো গাড়ির পদে পদে বিপত্তি, টানা কয়েকবার এটা সেটা
নষ্ট হয়ে একদিন হুট করেই বন্ধ হয়ে গেল। রিমি আবার সেদিন গেছে তার মায়ের বাসায়, রাতে
ফিরবে। নিকিতা বন্ধুদের সাথে কোন একটা প্রোগ্রামে গিয়েছিল, ফেরার পথে ওর গাড়িতে আমাকে
অফিস থেকে তুলে নেবে বলল।
“বাবা এক্ষুণি নামো, পার্কিং এ ঢুকব না”, নিকিতার ফোন পেয়ে হুড়োহুড়ি করে
নামলাম অফিস থেকে।
“এত তাড়া দিচ্ছিলি কেন? একটু দাঁড়ালে কী হয়?”
“আর বোলো না বাবা, এই ছোটলোক মেশিন রিকশাগুলির যন্ত্রণায় এখানে রাস্তায়
গাড়ি দাঁড় করানোই যাচ্ছে না।”
নিকিতার কথা আমার কানে পুরোপুরি ঢুকল না। আমার নাকে হুট করে ধাক্কা দিচ্ছে
একটা পরিচিত ঘ্রাণ—মৃদু, কেমন অস্বস্তিকর মিষ্টি মিষ্টি। আমি স্থির চোখে আমার কন্যার
মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।