Monday, October 05, 2026
ছোটদের বই: পর্ব ১
Tuesday, August 11, 2026
ঘ্রাণ
ঘ্রাণটা প্রথম আমার নাকে আসে যখন ছোটখালারা আমেরিকা থেকে বহুবছর পর দেশে বেড়াতে এলেন। খালু আমেরিকার একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান, তার বাবা পাকিস্তান আমলের সচিব গোছের কিছু ছিলেন, একমাত্র ভাই লন্ডনে বড়সড় কর্পোরেট চাকরি করেন—পুরো পরিবারটিই সমীহ করার মতো। কাজেই খালু এতবছর পর দেশে আসবেন, পরিবারে বেশ একটা হইচই পড়ে গেল। আমরা ভাল প্যান্ট শার্ট পরে সকাল সকাল নারিন্দায় নানুবাসায় গিয়ে হাজির হলাম। বিকেল পাঁচটায় খালাদের ফ্লাইট এয়ারপোর্টে নামল, বাসায় আসতে আসতে রাত ৮টা। কলিংবেলের শব্দে বাসার সবাই দরজার সামনে হাজির; খালা খালু তাদের একমাত্র মেয়ে আর বিশাল চারটা লাগেজ নিয়ে ঘরে ঢুকলেন। সাথে সাথেই আমার নাকে সেই ঘ্রাণটা এসে লাগল—মৃদু কিন্তু কেমন মিষ্টি মিষ্টি একটা ঘ্রাণ। আমার বয়স তখন এগারো, সেদিনের অনেক কিছুই এখন আর মনে নেই—কিন্তু ঘ্রাণটা মনে আছে। সেটা কীসের ঘ্রাণ তা আর জানার সুযোগ পাইনি, কারণ ঢাকার স্যাঁতস্যাঁতে আবহাওয়ায় একদিনের মাথায় খালাতো বোনটা বিশ্রী রকম ঠাণ্ডা জ্বর বাঁধিয়ে ফেলল। খালু তিনদিন মেয়ের জ্বর দেখলেন, চারদিনের মাথায় টিকেট কেটে সবশুদ্ধ শিকাগোর ফ্লাইটে চেপে বসলেন।
দ্বিতীয়বার এই ঘ্রাণটা যখন নাকে এলো তখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। বাবা
ধুম করে চলে গেলেন, মা আমাদের তিন ভাইকে নিয়ে অথৈ পানিতে। নারিন্দার বাসায় নানা নানু
নেই, বড়মামা আর মামী দুই ছেলেমেয়েকে নিয়ে থাকেন। মুখ ফুটে কেউই কিছু বলেন নি, কিন্তু
দুয়েকবার সেখানে যাওয়ার পর মা নিজে থেকেই সেখানে যাওয়া বন্ধ করে দিলেন; ভাড়া বাসা ছেড়ে
দিয়ে চলে গেলেন গাজীপুরে বাবার রেখে যাওয়া এক চিলতে টিনশেডের ঘরে। বাবার পেনশনের টাকায়
ছোট দুজনের স্কুলের বেতন আর বাসার খরচ কোনমতে চলে। কপালগুণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স
পাওয়ায় আমার পড়াশোনার খরচ নামমাত্র; কিন্তু খাওয়াদাওয়া, হাতখরচ, যাতায়াত ইত্যাদির চাহিদা
তো ছিলই। টাকার চিন্তায় মাথা খারাপ অবস্থা, এমন সময়ে এক বন্ধুর মারফতে এক টিউশনির খোঁজ
পেলাম বনানীতে—এ লেভেলের ছাত্রী, ফিজিক্স আর ম্যাথ পড়াতে হবে। অতি উৎসাহে সেদিন বিকেলেই
গিয়ে হাজির হলাম বন্ধুর দেয়া ঠিকানায়। বিশাল ফ্ল্যাটের বাইরে দুজন দারোয়ান, কলিংবেল
বাজাতে দরজা খুলে দিল ছাত্রী নিজেই। খুব টিপিক্যাল বড়লোকের আদুরে মেয়েদের যেমন চেহারা
হয় আর কি—টকটকে ফর্সা গোলগাল মুখ, মাথায় ছোট করে ছাঁটা ফ্যাশনেবল চুল, কানে গোঁজা ইয়ারফোন;
সুন্দর দুই চোখে বুদ্ধির ছাপ আছে বললে অবশ্য বাড়িয়ে বলা হবে। চৌকাঠ পেরিয়ে ঘরে ঢুকতেই
নাকে এসে লাগল সেই ঘ্রাণ—চাপা, কেমন অস্বস্তিকর রকম মিষ্টি মিষ্টি।
ভার্সিটির ছেলেপিলের টিউশনিতে আগ্রহের বিষয় থাকে দুটা—প্রথমটি অবশ্যই বেতন,
দ্বিতীয়টি হলো বিকেলের নাস্তা; ছাত্র মেধাবী বা বুদ্ধিমান টাইপ হলে সেটা পুরোই বোনাস।
প্রথম দুটো নিয়ে অভিযোগ নেই, তবে আমার ছাত্রীর বুদ্ধিশুদ্ধির দৌড় ভালোভাবে টের পেলাম
পড়াতে শুরু করার পর। এক পড়া হাজার বার বুঝিয়ে বললেও বোঝে না, থার্মোডিনামিক্সের সূত্র
জানতে চাইলে হাঁ করে মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। বেতন ও নাস্তা, দুটোই অতিশয় ভাল হওয়ায়
ঠিক রাগ করতে পারি না, ধৈর্য্য ধরে আবার বোঝাই। লিলি, মানে আমার ছাত্রীর বাবা মা বাসায়
থাকেনই না বলতে গেলে, তবে একজন বয়স্ক কাজের মহিলা সারাক্ষণই ঘরময় হেঁটে বেড়ান। কন্যার
দিকে নজরদারির কমতি না থাকলেও কন্যার পড়াশোনা নিয়ে তার বাবা মা কেউই খুব একটা বিচলিত
ছিল বলে মনে হয়নি। আমি পড়ানো শুরু করার পর থেকে পড়ালেখার অবস্থার অনেক উন্নতি হল এমন
না, তবে লিলির আচরণের পরিবর্তন দিনকে দিন বিপজ্জ্বনক রকম স্পষ্ট হয়ে উঠল। টিউশনিটা
ছেড়ে দেয়া খুবই উচিত, কিন্তু মাস শেষে ওই টাকাটার লোভ ছাড়তে পারি না।
নাহ, মিথ্যে বললাম আসলে। টাকাটাই একমাত্র বিষয় হলে বন্ধু শোভন যখন আরেকটা
টিউশনির অফার নিয়ে এলো, আরো বেশি টাকার; সেটায় রাজি হয়ে গেলাম না কেন? সত্যি বলতে রাজি
হয়েও যেতাম হয়ত, যদি না ওইদিনই লিলি হলের গেস্টরুমে এসে হাজির না হতো। আমি আমার জীবনে
এত অবাক কখনো হইনি, পুরো গেস্টরুম ঝলমল করছিল সেদিন। ও নাকি আসলে এসেছিল চারুকলায়,
বেশি আগে চলে এসেছে বলে সময় কাটাতে এসেছে আমার হলে। ওখানে নাকি কী একটা অসাধারণ প্রদর্শনী
চলছে—না দেখলে মানব জীবন বৃথা। যদিও গল্প করতে করতে এত দেরি হয়ে গেল যে প্রদর্শনীটাই
আর দেখা হলো না সেদিন। এরপর থেকে লিলি প্রায় প্রতিদিনই আসত, ক্লাস আর কোচিং এর ফাঁকে।
আমারও এমন অভ্যেস হয়ে গিয়েছিল যে কার্জন হল থেকে বের হয়েই চোখ চলে যেত সামনের রাস্তায়;
লিলির মেরুন রঙের গাড়িটা পার্ক করা আছে কিনা দেখতে। একবার ওর গাড়িতে জোর করে আমাকে
নিয়ে গেছিল একটা রেস্তোরাঁয়, গাড়ি জুড়ে সেই অস্বস্তিকর মিষ্টি ঘ্রাণ; আমাকে টানা উসখুস
করতে দেখে আর কখনো পরে জোর করেনি লিলি।
একদিন মেরুন গাড়িটি আর এল না। এরপর আর কোনোদিনই না। আমিও আর যাইনি ওদের
বাসায়। এভাবে কিছু না জানিয়ে টিউশনিটা ছেড়ে দেয়া নিশ্চয়ই ঠিক হয়নি। আর কিছু না হোক,
বেতনটা নিতে যাওয়া খুবই উচিত ছিল; মাসের শেষ, হাত পুরো খালি। কিন্তু মনে মনে যতবার
ভেবেছি, ওই ঘ্রাণটা কল্পনাতেও এমন অস্বস্তি নিয়ে এসেছে যে শেষে আর যাওয়াই হলো না।
লিলির সাথে আমার আর কোনদিন দেখা হয়নি।
বরাবরই ভাল ছাত্র, তাই পড়াশোনার পর চাকরি পেতে খুব একটা দেরি হলো না আমার।
চাকরিসূত্রে নানাজনের সাথে ওঠাবসা; আর ফিরে ফিরে আসা সেই ঘ্রাণ। সেবার এক ডিপ্লোম্যাটের
বাসায় পার্টিতে গিয়ে ঘ্রাণের তীব্রতায় দমবন্ধ হবার জোগাড় আমার। পার্টি শেষে গুলশান
থেকে মহাখালি, ফার্মগেট হয়ে হেঁটে ফিরেছিলাম বাসায়; মানুষের ঘামভেজা ভারী বাতাসও সেদিন
আমাকে এত শান্তি দিয়েছিল কেউ বললে বিশ্বাস করবে না।
সময় দ্রুত যায়, ব্যস্ত মানুষের সময় যায় চোখের পলকে। এম্ব্যাসির চাকরি থেকে
টপাটপ প্রোমোশন; তাতে অর্থের দৈন্য কাটল, নিজের এজেন্সি খোলার ঝুঁকি নেয়ার অবস্থা হবার
পর চাকরি ছাড়লাম। এজেন্সি খোলার পর সুনাম ছড়ালো দ্রুতই, একসময় জীবনের চাহিদা-যোগানের
সম্পর্ক নিয়ে দুশ্চিন্তা পুরোপুরি ঘুচল। অর্থের চাহিদা ছাড়াও মানুষ কেন কাজ করে সেটা
এক বয়সে বুঝতাম না—এখন বুঝতে শুরু করলাম, যে এটাও এক ধরনের অভ্যাস।
বিয়ে করেছি আজ সাড়ে সতেরো বছর হলো, আমার স্ত্রী রিমি আমার বন্ধুর ছোটবোন।
রিমি আপাদমস্তক সংসারি মেয়ে, আমার ব্যস্ত দৌড়ঝাঁপের জীবনে ঘরদোর, বাচ্চার পড়ালেখা সব
কীভাবে কীভাবে সুন্দর গুছিয়ে ফেলে আমি টেরও পাই না। আমাদের একমাত্র কন্যা নিকিতা এ
লেভেল দিয়েছে, এই বছরের শেষ দিকে আমেরিকা যাবে পড়তে। বাসার নতুন গাড়িটা ওকে দিয়েছি;
আমি আমার পুরনো মডেলটাই চালাই। পুরনো গাড়ির পদে পদে বিপত্তি, টানা কয়েকবার এটা সেটা
নষ্ট হয়ে একদিন হুট করেই বন্ধ হয়ে গেল। রিমি আবার সেদিন গেছে তার মায়ের বাসায়, রাতে
ফিরবে। নিকিতা বন্ধুদের সাথে কোন একটা প্রোগ্রামে গিয়েছিল, ফেরার পথে ওর গাড়িতে আমাকে
অফিস থেকে তুলে নেবে বলল।
“বাবা এক্ষুণি নামো, পার্কিং এ ঢুকব না”, নিকিতার ফোন পেয়ে হুড়োহুড়ি করে
নামলাম অফিস থেকে।
“এত তাড়া দিচ্ছিলি কেন? একটু দাঁড়ালে কী হয়?”
“আর বোলো না বাবা, এই ছোটলোক মেশিন রিকশাগুলির যন্ত্রণায় এখানে রাস্তায়
গাড়ি দাঁড় করানোই যাচ্ছে না।”
নিকিতার কথা আমার কানে পুরোপুরি ঢুকল না। আমার নাকে হুট করে ধাক্কা দিচ্ছে
একটা পরিচিত ঘ্রাণ—মৃদু, কেমন অস্বস্তিকর মিষ্টি মিষ্টি। আমি স্থির চোখে আমার কন্যার
মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
Saturday, November 01, 2025
নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে…
মানুষের স্মৃতি খুব অদ্ভুত। অনেক স্মৃতি আছে যেগুলো মনে না
থাকলে ক্ষতি নেই, অনেক স্মৃতি আদতে স্মৃতিই নয়; অন্যের মুখে শুনে মাথায় ভ্রম তৈরি করে,
স্মৃতির বেশ ধরে থাকে। এই যেমন, আম্মুর শৈশবের বন্ধু আরতী; যাকে আম্মু প্রায়ই স্বপ্নে
দেখত, যে অজানা জ্বরে ভুগে মারা গিয়েছিল খুব ছোট্টবেলায়; তাকে আমার দেখার প্রশ্নই ওঠে
না। কিন্তু আমার মাথার কোনো এক কোণে আরতীর একটা সাদা-কালো প্রায় ঝলসানো ছবি রয়ে গেছে।
সেই ছবি যে কাল্পনিক তাতে কোনোই সন্দেহ নেই, কিন্তু আমি চাইলেই ছবিটা স্পষ্ট দেখতে
পাই। আম্মু তার কথা খুব বলত, শৈশবে প্রথম বন্ধু হারানোর ধাক্কা সে পরিণত বয়সেও অনুভব
করত একইভাবে। সম্ভবত তার বোধ সৃষ্টির পর “মৃত্যু”কে অনুভব করা সেটাই প্রথম, সেই প্রগাঢ়
অনুভূতি তাকে ঘিরে রেখেছিল জীবনের শেষ পর্যন্ত।
এই যে লিখলাম, শেষ পর্যন্ত; কী সহজে! মানুষের শেষ কীসে হয়,
কখন হয়? শরীরের আয়ু ফুরালে? শরীর আর মনের আয়ু কি আলাদা? মানুষের বেঁচে থাকা কি তার
নিজস্ব যাপিত জীবনে—নাকি অন্যদের গভীরতম স্মরণে, উদযাপনে, স্মৃতিতে? আজ থেকে প্রায়
ষাট বছর আগে অজানা জ্বরে হুট করে হারিয়ে যাওয়া ছোট্ট বালিকা আরতী কি ভীষণভাবে বেঁচে
ছিল তার বন্ধুর স্মৃতিতে; এই এতগুলো বছর পরেও! এমনকি আমার, মানে এক প্রজন্ম পরের কোনো
একজনের স্মৃতিতে সাদাকালো ছবিতে অস্পষ্ট যে বালিকা বেঁচে থাকে, সে কি আরতী নয়—সে স্মৃতি
যতই বিভ্রম হোক?
শেষ কোথায়? শেষ কীসে? আজ তিন বছর হলো, আম্মু চোখ তুলে আমাদের
দেখে না, কথা বলে না, কিন্তু তাই বলে কি কিছু ফুরালো? একটা জমাট শূন্যস্থানের ওপারে,
যেই শূন্যস্থান ভেদ করে আমাদের দৃষ্টি, কথা, স্পর্শ পৌঁছাতে পারে না; সেখানটায় তার
কী প্রবল উপস্থিতি—নাহলে কেন একটা দিনও তাকে ছাড়া কাটে না এখনও?
মৃত্যু নিয়ে ধর্মীয়, অধর্মীয়, বস্তুগত, বৈজ্ঞানিক, অবৈজ্ঞানিক
যত ব্যাখ্যাই শুনি, মানুষের চলে যাওয়ার পরেও প্রবলভাবে রয়ে যাওয়ার এই মহাজাগতিক অনুভূতিকে
ধরতে পারার মতো কোনো ব্যাখ্যা পাই না। সত্যি বলতে এসব ব্যাখ্যা শুনতে ইচ্ছেও করে না।
আম্মুর নম্বরে ডায়াল করলে আম্মুর আদরমাখা গলাটা আর শুনিনা, চাইলেই আম্মুর মুখোমুখি
বসে চা খেতে পারি না, বহু আগে হারিয়ে ফেলা সলিল চৌধুরীর গানটা ইউটিউবে হঠাৎ পেয়ে গেলে
কাকে শোনাব বুঝে উঠতে পারি না… এই কষ্টগুলি ভোগায়, অনেক অনেক ভোগায়। কষ্টের তীব্রতা
সীমা ছাড়ায় যখন নিজের মেয়েটাকে দেখি, যাকে আম্মু কখনো ছুঁয়ে দেখতে পারে নি। কিন্তু
তার পরেও আম্মু নেই এমনটা তো মনে হয় না, এক মুহূর্তের জন্যেও না!
বিপুল বিস্তীর্ণ মহাজগতের সুবিশাল সময়ের স্কেলে যেই তুচ্ছ কটা
মুহূর্ত আমরা একেকজন মানুষ স্ফুলিঙ্গের মত বেঁচে থাকি—আমাদের স্মৃতি, কল্পনা, অনুভূতির
সীমা তো এতটাও ক্ষুদ্র নয়। স্পর্শের সীমার বাইরে চলে গেলেও সেই গাঢ় অনুভূতিতে তো রয়ে
যায় একেকজন মানুষ, তার হাসি, তার স্মৃতি।
আম্মু নিজে বুড়ো হবার ব্যাপারটা
একেবারেই পছন্দ করত না। আর কী অদ্ভুতভাবে তার বয়সটা এক জায়গায় থমকে গেল! আমরা বুড়ো
হয়ে যাব হয়ত একদিন, কিন্তু আকাশের ওপারে যেই আকাশ, সেখানে থাকা আম্মুর কিশোরী হাসিটা
একইরকম রয়ে যাবে—যতদিন আমরা থাকি। যতদিন কারো স্মৃতি, বা বিভ্রমে সেই হাসিটা বেঁচে
থাকে।
"নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে, রয়েছ নয়নে নয়নে,
হৃদয় তোমারে পায় না জানিতে, হৃদয়ে রয়েছ গোপনে..."
Friday, November 22, 2024
হাসনাহেনার ঝাড়: পর্ব- রং, সুর আর ঘ্রাণ
Tuesday, November 19, 2024
সময় আসুক, একদিন বুঝবা!
ক্লাস
সেভেনে রেজাল্ট বেশ খারাপ হয়েছিল, আগের সব বছরের চেয়ে খারাপ। তখন একটা ভয়ানক চল ছিল। এসএসসি আর এইচএসসিতে
স্ট্যান্ড করা, মেধাতালিকায় প্রথম দ্বিতীয় হওয়া কয়েকজনকে টিভিতে আনা হতো। চশমা পরা, বয়সের তুলনায় অস্বাভাবিক গম্ভীর
সেইসব ছেলেমেয়েরা তাদের সাফল্যের পেছনের পরিশ্রমের গল্প শুনাত; কেউ পড়ালেখা করেছে দিনে সতের ঘণ্টা, কেউ উনিশ। আমাদের মতো মাঝারি মানের
ছাত্রদের বাধ্যতামূলকভাবে সেই সব অনুষ্ঠান দেখতে হতো। উনিশ ঘণ্টা ক্লাসের বই পড়া? শুনেই দম আটকে আসত আমার; তাহলে গল্পের বই পড়ব কখন? আড্ডা মারব কখন? এইসব মুখ ফুটে বলা বিপজ্জনক, কাজেই চুপচাপ থাকতাম। এসব অনুষ্ঠান
দেখেও আচরণের আশানুরূপ পরিবর্তন না দেখায় মুরুব্বিরা গম্ভীর মুখে বলত,
“সময় আসুক, ঠিকই বুঝবা, তখন আফসোস করবা!”
সেভেনের
সেই রেজাল্টের পর সবার মুখ থমথমে। পারিবারিক আলোচনায় অসংখ্য উপদেশ, এই রেজাল্ট নিয়ে জীবনে কী ভয়াবহ
পরিণতি অপেক্ষা করছে তার রোমহর্ষক বর্ণনার পর সবশেষে সেই অমোঘ বাক্য “সময় আসুক, একদিন বুঝবা!”
মাঝারি
রেজাল্ট করে স্কুল কলেজ পাশ করলাম, মেডিক্যাল বুয়েট না হলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উৎরে গেলাম। সেভেনের সেই
রেজাল্ট আমার নিজেরই আর মনে রইল না। এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে রেজাল্টের লক্ষণীয়
উন্নতি হওয়ায় কিছুদিন পর সেই আপ্তবাক্য পড়ালেখা ছেড়ে অন্যদিকে ঘুরে গেলো।
“রান্নাবান্না কিছুই শেখ নাই? ঘরের কাজও তো পারো না। জীবন চলবে কেমনে? এখন তো বুঝতেস না; সময় আসুক, একদিন বুঝবা!”
সেই
একদিনের আশঙ্কা বুকে নিয়েই পড়ালেখা শেষ করলাম। আঁকাআঁকি করি, উন্মাদে যাই, নিউ এইজে কার্টুন আঁকি। সবার মুখে
হাসি ফুটিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করলাম। সামাজিক বিচারে এলিট
শ্রেণিতে নাম লেখালাম, ভাবলাম এবার মুক্তি! কিন্তু না!
“এখনো বিয়ে করো নাই? বয়স তো চলে যায়! আজকালকার মেয়েরা ক্যারিয়ারের পেছনে ছুটতে ছুটতে সংসার ভুলে
যায়। সময় আসুক, একদিন বুঝবা কতবড় ভুল করতেস!”
রাজশাহীতে
একার সংসার। ক্লাসে মহা উৎসাহে ছাত্র পড়াই, নিজের ঘরে বসে কার্টুন আঁকি; সপ্তাহান্তে ঢাকায় এসে বাসায় সময়
কাটাই, উন্মাদে
গিয়ে আড্ডা দিই; নিরুদ্বেগ জীবন! এদিকে চারপাশ থেকে একটাই কথা, “একদিন বুঝবা!” চেনা, অচেনা, আধচেনা মানুষজন বিয়ের প্রস্তাব
নিয়ে হাজির হয়ে যাচ্ছে, সবারই দেখছি পরিচিত কোনো না কোনো ‘এলিজিবল ব্যাচেলর’ আছে।
এই
যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে এমনটা নয়; বরং নিজের পছন্দেই একসময় বিয়ে করে ফেললাম, সামাজিক বিচারে সামান্য ‘বেশি বয়সে’ যদিও।
ভাবলাম, এবার তো আর
চিন্তা নাই, প্রপার সামাজিক জীবন!
কিন্তু
না, ছয় মাস না
যেতেই নতুন পেরেশানি, “বাচ্চা নেবে কবে?”
প্রথম
প্রথম দুইজন এই প্রশ্ন হাসিমুখে এড়িয়ে যাই, তারপর থেকে যারা বলে তাদেরকেই এড়াতে শুরু করি; কিন্তু আলোচনা থামে না। বয়স বেড়ে
যাচ্ছে, মেয়েদের
বাচ্চা মানুষ করাই আসল কাজ, মা হওয়াটাই আসল ক্যারিয়ার, ইত্যাদি ইত্যাদি বহু বাক্যের পর আসে সেই অমোঘ বাক্য, “সময় আসুক, একদিন বুঝবা!”
এই বাক্য
এক কান দিয়ে শুনতে শুনতে এতদিনে আরেক কান দিয়ে বের করাও শিখে গেছি। এদিকে সময় গড়ায়, আমরা আমাদের দুই শহরে পেতে রাখা ভ্রাম্যমান
সংসারে অভ্যস্ত হয়ে উঠি। তবে কথায় আছে সুখে থাকলে মানুষ ভুতের কিল খায়; আমি খেলাম ব্রহ্মদত্যির কিল!
পরিবার-পরিজন-শুভানুধ্যায়ী সবার হৃদয় ভেঙে দিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি
ছেড়ে দিয়ে স্বাধীন পেশায় ফিরলাম। নিজের মতো কাজ বাছি, কাজ করি, ইনকাম যা হয় তাতে আমার ভালভাবেই
চলে যায়। সময়ে অসময়ে নানা জনের আফসোস,
“এমন চাকরি কেউ ছাড়ে? বয়স কম তো, তাই বুঝতেস না। সময় আসুক, একদিন বুঝবা!”
এদিকে
বাচ্চা নেয়া বিষয়ক প্রশ্নবাণও থেমে নেই। এভাবেই বেশ কিছু বছর কাটে, একসময় আমরা সত্যি সত্যি পরিবারে
নতুন সদস্য আনতে আগ্রহী হই। তার দেড় বছরের মাথায় আমাদের ঘর থেকে একজন অতিদুরন্ত
কন্যাশিশুর গলা শুনতে পাওয়া যায়।
পড়ালেখা-ক্যারিয়ার-বিয়ে-বাচ্চা
সব তো হলো, ভাবলাম
আমাদের নিয়ে লোকের আফসোসের কাল তবে শেষ হল! দুইজন মহাসুখে বাচ্চা পালি, ঘরের-বাইরের কাজকর্ম করি; মোটামুটি নির্বিঘ্ন জীবন।
অনু, মানে আমাদের মেয়ের বয়স আট মাস হলো।
সদ্য সলিড খাবার শুরু করেছে, বিভিন্ন খাবারের স্বাদের সাথে পরিচিত হচ্ছে, আমাদের খাবার টেবিলে ছোট ছোট থালাবাটির সংযোজন
ঘটছে। সে যা খায়, তার চেয়ে বেশি মাখে, আমরা দুইজন সেই দৃশ্য মুগ্ধ হয়ে দেখি। যখন আমাদের অবাক করে অতিদ্রুত সে
কিছু শিখে ফেলে, আমরা আবেগে আপ্লুত হয়ে যাই। মেয়ের জন্মের পর আমাদের ফোন এবং টিভির ব্যবহার
আগের চেয়েও কমে গেছে, বাচ্চার স্ক্রিনে আসক্তি যাতে না হয় তার শুরু হিসেবে নিজেদের আসক্তি কমানোর
চেষ্টায় আছি দুইজনেই। সেদিন এক দাওয়াতে গেলাম, সেখানে বিভিন্ন বয়সী বাচ্চাকাচ্চা, এবং বিভিন্ন বয়সী বাবা-মা। বছর
তিনেকের এক পিচ্চিকে খাওয়ানোর জন্য এক মা প্লেটে খাবার মেখে বসেছে। এদেশের খুব
সাধারণ দৃশ্য, ভদ্রমহিলা নিজের স্মার্টফোনে কিছু একটা চালু করে পিচ্চির হাতে দিল; পিচ্চি সম্মোহিতের মত সেই জিনিস
দেখতে দেখতে হাঁ করছে, আর তার মা সেখানে খাবার পুরে দিচ্ছে। আমাদের চেহারায় জাজমেন্টাল ভাব যাতে
ফুটে না ওঠে সেজন্য আমরা অন্যদিকে তাকিয়ে খেয়ে নিচ্ছি। একসময় উনি নিজেই বলে ওঠেন,
“ভাবী, বাচ্চাকে ফোন দেন না? খাওয়ান কীভাবে?”
“ফোন দেই না আপা, এমনিতেই খায়।”
“তাহলে কি টিভি দেখতে দেখতে খায়?”
“না আপা, ও নিজের ইচ্ছাতেই খায়। আর খেতে না চাইলে জোর করে খাওয়াই না।”
ভদ্রমহিলা
চোখ কপালে তুলে তাকালেন, উত্তর খুঁজছেন। অনুর দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ কী যেন ভাবলেন। তারপর হাসিমুখে
তাকিয়ে বললেন,
“ওহ! আপনার বাচ্চা তো ছোট! বড় হলে ঠিকই সামনে ফোন দেয়া লাগবে! না দিলে খাবেই
না!”
আমরা
একটু ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করার চেষ্টা করলাম, ফোন সামনে নিয়ে খাওয়ানোর অভ্যেস আমরা না করালে
এই অভ্যেস নিজে নিজে কীভাবে হবে? ভদ্রমহিলা আমাদের প্রশ্নকে উড়িয়ে দিয়ে ছাড়লেন সেই ব্রহ্মাস্ত্র!
“নিজেদের সময় আসুক, একদিন ঠিকই বুঝবেন!”
আপাতত
আমরা সেই ‘একদিনের’ অপেক্ষায় আছি।
সম্ভবত বাকি জীবন এই অপেক্ষাতেই কাটবে।
Friday, July 19, 2024
Tuesday, October 31, 2023
হাসনাহেনার ঝাড় (পর্ব: শিউলী ফুলের ঘ্রাণ)
![]() |
| তিন দশকেরও বেশি আগে আম্মুর করা এম্ব্রয়ডারি, সেই শিউলি মালা |
![]() |
| ২০১৩ সালে করা কুইক স্কেচ... যখন চাইলেই সামনে বসে আম্মুকে আঁকা যেত |
Wednesday, April 12, 2023
Friday, April 07, 2023
হাসনাহেনার ঝাড় (পর্ব: প্রথম ইশকুল)
আমার জীবনে শেখা প্রথম কঠিন বানান হলো ENGINEER।
বাপ রে, কত্তগুলো অক্ষর! বানানের সাথে উচ্চারণের মিল থাকলেও না হয় মনে রাখা যেত! তাও না। ইঞ্জিনিয়ার যদি হয় উচ্চারণ, তবে বানানটা হবার কথা INJINIAR। এমন আজব কেনো বানানের নিয়ম তা আমার ছোট মাথায় ঢুকতই না।
EN-GI-NEER, আম্মু এভাবে ভেঙে ভেঙে শেখাত। বড় শব্দকে তিন টুকরা করে, ভাত খাওয়ানোর সময় বড় লোকমাকে ছোট ছোট করে পায়রার ডিম, মুরগির ডিম বানিয়ে যেভাবে খাওয়াত, অনেকটা সেভাবে। তো ঐ বয়সে এই শব্দ শেখার দরকার কেনো পড়ল? ওই যে- স্কুলে ইংরেজি ক্লাসে যখন নিজের সম্পর্কে লিখতে হতো, ‘My father is an engineer, my mother is a housewife…’। তখন মনে হতো, আব্বু ইঞ্জিনিয়ার না হয়ে সহজ কিছু কেনো হলো না- এই যেমন Farmer, Doctor, এরকম কিছু। এক বন্ধুর বাবা ছিলেন ব্যবসায়ী, তাকে ‘My father is a businessman’ লিখতে দেখে আমার রীতিমত মায়াই লেগেছিল!
এইটুকু পড়ে মনে হতে পারে, কঠিন কঠিন শব্দে অনেক ভীতি ছিল আমার। কথাটা আংশিক সত্যি। ইংরেজি গল্পের বই আম্মু টুকটাক পড়ে শোনাতো বটে, কিন্তু কঠিন শব্দ বানান বুঝে পড়া তখনো শিখিনি। বাংলা বরং অনেক সোজা, গল্প আর ছড়ায় কঠিন কঠিন শব্দগুলোও কী সুন্দর ঠিক ঠিক এঁটে যায়! আম্মু আমাদের দুই বোনকে কোলের উপর বসিয়ে যখন ‘পুরাতন ভৃত্য’ বা ‘দুই বিঘা জমি’ আবৃত্তি করে শোনাতো, মোটেও কঠিন মনে হতো না লাইনগুলো। তবে এগুলো বড় দুঃখের কবিতা। আমার বেশি প্রিয় ছিল ‘খাঁদু দাদু’ আর ‘লিচু চোর’।
দুঃখের কবিতাগুলো আমার কাছে মনে হতো যেন ঠিকমত শেষ হয়নি, যেন আরো কিছু ঘটার কথা ছিল। ‘পুরাতন ভৃত্য’ পড়ে একেবারে মুষড়ে গেছিলাম, কেষ্টা যে একেবারে মরেই গেল! মরে যাবার পরে যে আর কিছু ঘটবার থাকে না তা বোঝার বয়স তখনই হয়েছিল।
তবে আম্মু বোধ হয় তার বছর পাঁচেকের কন্যার মন খারাপটা দেখতে চায়নি। তাই আমাদের পড়ে শোনানোর সময় কবিতার শেষটুকু প্রায়ই বদলে যেত। ‘দুই বিঘা জমি’ তে জমিদারবাবু উপেনের জমি কীভাবে ‘ডিক্রি’ জারি করে হাতিয়ে নিল তা আমি মেনেই নিতে পারতাম না। বলতে গেলে বাধ্য হয়েই, আম্মু কবিতার শেষটা সামান্য পাল্টে দিলো। তাই আমার ছোটবেলার স্মৃতিতে ‘দুই বিঘা জমি’তে পুরোদস্তুর হ্যাপি এন্ডিং, কবিতার শেষ লাইন আর উপেনের মুখে রইলো না। বরং শেষ দৃশ্যে বাবু নিজেই তার ভুল বুঝতে পেরে উপেনের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছে,
‘তুমি মহারাজ, সাধু হলে আজ, আমি আজ চোর বটে।’
পরপারে বসে রবি ঠাকুর নিশ্চয়ই আম্মুর এই নিদারুণ অপরাধ ক্ষমা করে দিয়েছিলেন!
রবীন্দ্র-নজরুলের সাথে আম্মুর এই সখ্যতার কারণে আমাদের ভাণ্ডারে শব্দের কমতি ছিল না। একবার থ্রি-ফোরে থাকতে একটা কঠিন বাংলা শব্দ শেখা হলো- ‘পৃষ্ঠ-পো-ষ-ক-তা’, কোন বই থেকে পড়েছিলাম এখন আর মনে নেই। তবে বেশ পছন্দ হলো শব্দটা, মুর্ধন্য-ষ, ঠ, ক, ত মিলিয়ে বেশ একটা এলাহি অবস্থা, লিখতে গেলেই নিজের মধ্যে বেশ জ্ঞানী জ্ঞানী ভাব চলে আসে। প্রথম সুযোগেই এই শব্দ চালিয়ে দিয়েছিলাম বাংলা পরীক্ষার খাতায়, বাংলা শিক্ষকের অবাক করা চেহারা দেখে বেশ একটা গর্বও হয়েছিল মনে পড়ে। সেই গর্ব ভাঙতে বেশিদিন লাগে নি, তবে সে কথায় পরে আসি।
সত্যি বলতে, তখন পর্যন্ত স্কুল আমার বেশ ভালই লাগত। আসলে স্কুল যে একটা টর্চার সেল, সেটা বুঝেছি বেশ কবছর স্কুলে যাবার পর। এটার বড় কারণ খুব সম্ভবত প্রথম স্কুলের অভিজ্ঞতা। প্রথম স্কুল বলতে আমাদের কাছে যা ছিল তা হলো সন্ধ্যাবেলায় আম্মুর কাছে পড়তে বসা। তবে সে স্কুলেও কায়দা কানুনের অভাব ছিল না। সিরামিক আর মেলামাইনের ভরভরন্ত কালের আগে মধ্যবিত্ত বাসাবাড়িতে খাওয়া হতো স্টিলের প্লেটে। সেই স্টিলের প্লেট আর ভাতের চামচ হতো আমাদের স্কুলের ঘণ্টা। আমরা দুই বোন গম্ভীর মুখে ব্যাগে বইপত্র নিয়ে রেডি হয়ে পাশের ঘরে অপেক্ষা করতাম, আর ঘণ্টা পড়লেই আমাদের ছোট্ট পড়ার টেবিলে এসে বসতাম। আম্মু হতো ক্লাস টিচার, আর টিফিনে থাকত বাসায় বানানো হালকা পাতলা নাশতা। এই স্কুলের বইপত্র ছিলো বিচিত্র। কলকাতায় ছাপা বিমল দাসের আঁকা ছবির সাথে ছড়া আর গল্পের বই থাকতই, আর থাকত এপার-ওপার বাংলা মিলে নানা জাতের বাংলা বর্ণ আর শব্দ শেখার বই, তবে আমাদের সবচেয়ে প্রিয় ছিল টোনাটুনির ক্যাসেট। মজিবুর রহমান দিলু, যাকে আমরা সংশপ্তকের ‘মালু’ নামেই চিনতাম, তার ভরাট গলায় যখন বেজে উঠত ‘এবার ক্যাসেটটা উল্টিয়ে দিয়ে শোনো…’, আমাদের দুই বোনের কাড়াকাড়ি লেগে যেত কে আগে গিয়ে ক্যাসেট ওল্টাবে।
(চলবে)
Tuesday, November 22, 2022
হাসনাহেনার ঝাড় (ভূমিকা পর্ব)
“You want to know so much about his death, but what do you know about his life?”
~ Loving Vincent
আম্মু চলে যাবার আজকে ২২তম দিন। জীবনের কঠিনতম তিনটি সপ্তাহ আইসিইউর সামনে কাটানোর পর গত এই কটি দিন কীভাবে গিয়েছে আমরা কেউই জানিনা। হাসপাতালের পুরো সময় শুভাকাঙ্খিরা সমবেদনা জানিয়েছেন, খোঁজ নিয়েছেন। আত্মীয়-অনাত্মীয়রা অপ্রত্যাশিত ভালবাসা যেমন দেখিয়েছেন, পাশেও দাঁড়িয়েছেন সকল প্রয়োজনে।
তারপর এক বিষণ্ণ ভোরে আমাদের সব প্রয়োজন ফুরালো, আমাদের আটকে থাকা নিঃশ্বাসটা দীর্ঘশ্বাস হয়ে ঠিকানা হারালো। এমন ঘটনায় কাছের-দূরের সকলে দুঃখিত হয়, সমব্যাথী হতে চায়। জানতে চায়- কী হয়েছিল? কীভাবে এমন হলো? আর কি কিছু করার ছিল না?... সংক্ষেপে উত্তর দিই। কিন্তু উত্তরের পিঠে চেপে আসে আরো বহু প্রশ্ন- সার্জারি, ভেন্টিলেশন, আইসিইউ... পৃথিবীর নিষ্ঠুরতম শব্দগুলো সুঁচের মত গেঁথে গেঁথে বসে বুকে পিঠে। দ্রুত কথা সেরে প্রসঙ্গ পাল্টাই। পরদিন আবার, অন্য কেউ, অন্য কোথাও, একরাশ দুঃখ নিয়ে জানতে চায়- কী করে হলো?...
হঠাৎ আবিষ্কার করি, মানুষ আসলে জীবনের চেয়ে মৃত্যু নিয়ে বেশি কৌতূহলী। অথচ মৃত্যু কি আশ্চর্য নির্বিকার একটা ঘটনা, যেখানে এসে সব মানুষ মিলে মিশে এক হয়ে যায়। ঠিক যেমন কবরস্থানের সারি বেঁধে শুয়ে থাকা মানুষগুলোকে দেখতে হুবহু একই মনে হয়। মৃত্যুর আয়োজনটাও তো একইরকম নির্বিকার- যেকারণে আইসিইউতে সারি সারি বেডে শুয়ে থাকা মানুষগুলোকে হঠাৎ করে দেখলে আশ্চর্যজনকভাবে একইরকম দেখায়! অথচ এই নৈব্যক্তিক বিষয়াদি দিয়েই আমরা জানতে চাই, চিনতে চাই, সংজ্ঞায়িত করতে চাই মানুষকে। এ কী ভীষণ অন্যায়!
প্রতিটি মানুষ যদি অনেকগুলো গল্পের সমষ্টি হয়, তবে সেই গল্পগুলোই তো তার সত্ত্বা, তাকে চেনার, জানার, ছুঁয়ে দেখার উপায়। আম্মুর গল্পগুলো তাই আমি খুব করে বলতে চাই। মনে না থাকা শৈশবে, যেই স্মৃতি বা বিস্মৃতিতে শিউলী ফুলের ঘ্রাণকে কিছুতেই আমি আম্মুর শাড়ির ঘ্রাণ থেকে আলাদা করতে পারিনা; সেই ভুলে যাবার কালে- যেসময়ের টুকরো স্মৃতিতে হঠাৎ হঠাৎ আম্মুর হাসির পাশে উঁকি দেয় বারান্দায় ফোটা সূর্যমুখী ফুল; সেই সময়ের ঘ্রাণ আমি টুকে রাখতে চাই। এই গল্পগুলো বলার আয়োজন হয়ত বড় বেশি ব্যক্তিগত, তাতে কী?
এই যাহ, বলতে ভুলেই গিয়েছিলাম।
শুভ জন্মদিন আম্মু!
নভেম্বর ২২, ২০২২






