Monday, October 05, 2026

ছোটদের বই: পর্ব ১

"বাচ্চার বই পড়ার অভ্যেস কীভাবে করাব?"

হরহামেশাই শুনতে পাওয়া যায় এমন একটা প্রশ্ন। এর উত্তরে যে পাল্টা প্রশ্ন চলে আসে তা হলো, বাবা মায়েরা কি বই পড়েন? বাসায় কি শিশুটি কাউকে বই পড়তে দেখে? কাউকে ছোট করার উদ্দেশ্যে বলছি না, সবাইকে সারাদিন বই পড়তেই হবে, বা সবার আগ্রহ থাকবেই, এমনও না। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, শিশু যা দেখে তাই শেখে। ছোটবেলা থেকে বই পড়তে দেখলে, বাসায় বইয়ের সংস্পর্শে থাকলে, বই পড়ার চর্চার মধ্যে বেড়ে উঠলে, বইয়ের প্রতি আগ্রহ এমনিতেই জন্মানোর কথা। নতুন বই পড়া মানে তো নতুন নতুন গল্প, আর গল্প ভালবাসে না এমন কোনো শিশু নেই। সমস্যা হচ্ছে, আমাদের প্রজন্মের অনেক মানুষ, যারা বেড়ে উঠেছেন সেবা প্রকাশনী, হুমায়ুন আহমেদ আর মুহম্মদ জাফর ইকবালের তৈরি কল্পনার ভুবনে, যাদের প্রধান বিনোদন ছিল বই, টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে ১০ টাকার তিন গোয়েন্দা কেনা যাদের শৈশবের সুখস্মৃতি—তাদের অনেকেই একটা বয়সে এসে বইয়ের সেই নেশাটা হারিয়ে ফেলেছেন। প্রধান কারণ হাতের তেলোয় রাখা ডিভাইসে অসংখ্য নতুন, সহজলভ্য বিনোদনের মাধ্যম চলে আসা। কিন্তু কারণ যাই হোক, বই পড়ার অভ্যেস হারানোর ঘটনাটা অনেকের জন্যই সত্যি। এই মানুষগুলো যদি নিজেদের ছোটবেলার বই পড়ার সেই নিখাদ আনন্দটা ফিরিয়ে আনতে পারেন, শিশুসন্তানকে বইয়ে আগ্রহী করতে এর চেয়ে ভাল উপায় আর হয় না।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে, ধরে নিলাম বাবা মায়ের বই পড়ার অভ্যেস নেই, সেক্ষেত্রে শিশুটি কি বই পড়বে না? বা তাকে কি বই পড়ানো সম্ভব না? অবশ্যই সম্ভব! কিন্তু সেক্ষেত্রে মা বাবার কষ্ট একটু বেশি হবে। প্রথমত, যারা নিজেরা পড়েন না, তাদের জন্য ভাল বই খুঁজে বের করা একটু হলেও বেশি কঠিন। দ্বিতীয়ত, বাচ্চাকে বই পড়তে আগ্রহী করতে প্রচুর বই পড়ে শোনানো জরুরি, সেজন্য যথেষ্ট ধৈর্য্য প্রয়োজন (রাত আড়াইটায় ঘুম ভেঙে কন্যা/পুত্র যখন বলবে “একটা বই পড়ে শোনাও”, এবং আপনার সকালে অফিস মিটিং বা ডেডলাইনের চাপ, তখন এই যাতনা বুঝবেন, তার আগে না)। সারাদিন অফিস সেরে অনেকেরই সেই এনার্জি থাকে না। আর যাদের হাতে সন্তান দেখাশোনার ভার দিয়ে আমরা কর্মজীবি মা বাবারা বাসার বাইরে থাকি তাদের কাছ থেকে এটা আশা করা কঠিন; বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তারা শিশুকে বই পড়ে শোনানোর জন্য উপযুক্ত মানুষ নন।

তৃতীয় বিষয়টি হলো এই সময়ে দুনিয়াব্যাপী বইয়ের সবচেয়ে বড় শত্রু—স্মার্টফোন বা টিভি! বাচ্চার এই আসক্তি ধরে গেলে সেখান থেকে ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত কঠিন। মোবাইল গেইম বা টিভি/ইউটিউবের কোকোমেলনের মতো কনটেন্ট শিশুর মস্তিষ্কে যেই উচ্চ স্টিমুলেশন তৈরি করে তার কোনো তুলনা নেই। এই আসক্তির ফলে সবার আগে যেটা হারিয়ে যায় সেটা হলো ধৈর্য্য, সুস্থির কনটেন্টের প্রতি আগ্রহ। বইয়ের ক্ষেত্রে যা থাকে তা হলো লেখা এবং বড়জোর ছবি, বাদবাকি পুরোটাই কল্পনা; এবং শিশুর কল্পনাশক্তির বিকাশে এর প্রয়োজনীয়তা কেউই অস্বীকার করবেন না। কিন্তু স্ক্রিন এক্সপোজারের রাশ না টানা গেলে বইয়ের প্রতি আগ্রহী করা বেশ কঠিন। শিশুর স্ক্রিন এক্সপোজার শূন্যতে নামিয়ে আনা হয়ত সবার জন্য সম্ভব না, কিন্তু রাশ টানা খুব জরুরি।

এবং আবারও আগের প্রশ্নটাই করতে হয়, শিশু কি মা বাবাকে সারাক্ষণ স্মার্টফোন হাতে অকারণ স্ক্রলিং বা রিলস দেখতে দেখে? যদি দেখে তাহলে তার কাছ থেকে এর চেয়ে ভিন্ন আচরণ আশা করা কি যৌক্তিক? বাচ্চার স্ক্রিন আসক্তি কমাতে হলে আগে নিজেদের, এবং দাদী-নানী সহ বাসার অন্য সদস্যদের স্ক্রিন আসক্তি কমানো জরুরি। নাহলে এর সমাধান আছে বলে আমার মনে হয় না।

বই রিভিউর লোভ দেখিয়ে অনেক কড়া কড়া কথা বলে ফেললাম। আগামী পর্ব থেকে বই রিভিউ শুরু।

ঠিক শৈশব না, আমার কৈশোরের সবচেয়ে প্রিয় বইয়ের ছবি দিয়ে আজকের মতো আলাপ শেষ করি।